ইসহাক খন্দকারের জীবনী
নোয়াখালীতে ইসলামী আন্দোলনের উজ্জ্বল তারকা ইসহাক খন্দকার। তিনি দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রত্যায়দীপ্ত কাফেলা জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সদস্য ও নোয়াখালী জেলার আমীর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বাংলাদেশের এই উপকূলীয় অঞ্চলে ইসলামের খেদমতে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে যাচ্ছেন।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে, ১৯৫৯ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম নেন ইসহাক খন্দকার। তাঁর শৈশব কেটেছে গ্রামীণ সরলতা আর ধর্মীয় অনুশাসনের মাঝে। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও দায়িত্বশীল। ১৯৭৪ সালে সোন্দাইল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করার পর, তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম নিজামপুর কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৭৮ সালে সেখান থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৮১ সালে চৌমুহনী এসএ কলেজ থেকে অর্জন করেন বিএসসি ডিগ্রি। এই সময়গুলোতেই তাঁর মনে প্রখরভাবে দানা বাঁধতে থাকে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন। অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার মতো ঢাকায় থেকে নোয়াখালীর উন্নয়নের স্বপ্ন দেখাননি তিনি, নোয়াখালীর মাইজদীতে থেকেই ইসহাক খন্দকার সেই সমাজ পরিবর্তনের কাজ করতে থাকেন।
কর্মজীবন
শিক্ষা ও সমাজ সেবার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। ১৯৮১ সালে দূর্গাপুর হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তিনি কর্মজীবনের সূচনা করেন। এরপর ১৯৮৭ সালে সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন বেগমগঞ্জ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। এই স্কুলটি তাঁর কর্মজীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল, যেখানে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। নোয়াখালীর বিভিন্ন সরকারি মাধ্যমিক স্কুলেও তিনি শিক্ষকতা করেছেন। তবে, তৎকালীন সরকার কর্তৃক তাঁকে বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়, যেখানে তিনি চাকরি জীবনের শেষ চার বছর সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতা তাঁর কাছে কেবল একটি পেশা ছিল না, এটি ছিল একটি মিশন, জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মিশন।
রাজনৈতিক জীবন
ইসহাক খন্দকারের রাজনৈতিক জীবন ছিল এক আপসহীন সংগ্রাম ও ত্যাগের গৌরবময় অধ্যায়। ১৯৭৬ সালে নিজামপুর কলেজে তাঁর ছাত্ররাজনীতির হাতেখড়ি হয়। এরপর ১৯৭৯ সালে তিনি শহীদী কাফেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগদান করেন, যখন তিনি চৌমুহনী এসএ কলেজে বিএসসি অধ্যয়নরত ছিলেন। ১৯৮০ সালে তিনি ছাত্রশিবিরের সাথী হন। ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার সাথে সাথেই, ১৯৮২ সালে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং ১৯৮৩ সালে জামায়াতের রুকন পদ লাভ করেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা দ্রুতই প্রকাশিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে তিনি চৌমুহনী শহরের দায়িত্বশীল মনোনীত হন। ১৯৮৫-১৯৮৬ সালে তিনি জামায়াতের বেগমগঞ্জ উপজেলার সেক্রেটারি হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সততা, দক্ষতা ও দূরদর্শিতা তাঁকে দলের উচ্চ পদে নিয়ে যায়। ১৯৮৮ সালে তিনি জেলা শুরা সদস্য ও কর্মপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৯ সালে তিনি কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য এবং জেলা নায়েবে আমীর হিসেবে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। অবশেষে, ২০২২ সালে তিনি নোয়াখালী জেলা আমীর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এই অঞ্চলের ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন।
পারিবারিক জীবন
ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন একজন আদর্শ পরিবারকর্তা। ১৯৮৫ সালে তিনি তাহমিনা আক্তারের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি নিজেও জামায়াতে ইসলামীর একজন রুকন ও জেলা কর্মপরিষদ সদস্য। তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল ইসলামী আদর্শে প্রোথিত। এই দম্পতির পাঁচ সন্তান, দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত এবং তাঁদের পিতা-মাতা’র আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলামী আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। ইসহাক খন্দকারের পারিবারিক জীবন ছিল তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের এক অদম্য শক্তি।
নেমে আসা জুলুম নির্যাতন
ছাত্রজীবন থেকেই ইসহাক খন্দকার হকপন্থী হওয়ার অপরাধে নানান স্বৈরাচারী শাসকের রোষানলে পড়েন। স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করায় তিনি নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৯২ সালে ঘাদানিক প্রতিষ্ঠা হলে তিনি আওয়ামীলীগ ও বাম সন্ত্রাসীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী আমলেও সন্ত্রাসীরা তাকে অত্যাচার ও নির্যাতন করে।
তবে ইসহাক খন্দকার ভয়াবহ নির্যাতনের মুখোমুখি হন ফ্যসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে। ২০১৩ সালে তার পরিবার নোয়াখালী থেকে হিজরত করতে বাধ্য হয়। তার বড় ছেলেকে পুলিশ গুলি করে জীবন হুমকির মুখে ফেলে দেয়। ছোট ছেলেকে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা নির্যাতন করে। ২০১৪ সালে পুলিশ ইসহাক খন্দকারকে ধরে নিয়ে গিয়ে দুই পায়ে গুলি করে এবং আওয়ামী লীগপন্থী ডাক্তারের সহযোগে তাকে পঙ্গু করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে। সবশেষ তাঁকে নোয়াখালী থেকে বের করে দেওয়ার জন্য বান্দরবন ট্রান্সফার করে। এতেও তারা ক্ষান্ত হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে চাকুরি থেকে সাসপেন্ড করে।
ইসহাক খন্দকারের এই রাজনৈতিক পথ ছিল কাঁটা বিছানো, রক্তে রাঙানো। ইসহাক খন্দকার তাঁর হকপন্থী অবস্থানের কারণে বারবার বিভিন্ন স্বৈরাচারী শাসকের রোষানলে পড়েছেন। স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি তীব্র নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৯২ সালে ঘাদানিক প্রতিষ্ঠা হলে তিনি আওয়ামী লীগ ও বাম সন্ত্রাসীদের দ্বারা শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও সন্ত্রাসীরা তাঁকে অত্যাচার ও নির্যাতন করে। কিন্তু সমস্ত পূর্ববর্তী নির্যাতনকে ম্লান করে দেয় ২০১৩ সালের পর তাঁর উপর নেমে আসা ফ্যাসিবাদী সরকারের ভয়াবহ নিপীড়ন।
তাঁর পরিবারকে নোয়াখালী থেকে হিজরত করতে বাধ্য করা হয়। তাঁর বড় ছেলেকে পুলিশ নির্মমভাবে গুলি করে, যা তার জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। ছোট ছেলেকে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীরা অমানুষিক নির্যাতন করে। ২০১৪ সালের এক কালো দিনে, পুলিশ ইসহাক খন্দকারকে ধরে নিয়ে গিয়ে তাঁর দুই পায়ে গুলি করে এবং আওয়ামীপন্থী ডাক্তারদের সহযোগিতায় তাঁকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করা হয়। এরপরও তাঁর উপর থেকে নির্যাতন থামেনি; তাঁকে নোয়াখালী থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়। এখানেই শেষ নয়, তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে চাকরি থেকে সাসপেন্ড করা হয়। এক সংগ্রামী শিক্ষকের কর্মজীবনের উপর নেমে আসে চরম আঘাত। কিন্তু এত জুলুম-নির্যাতনও তাঁর আদর্শিক মেরুদণ্ডকে বিন্দুমাত্র বাঁকাতে পারেনি।
একজন পরোপকারী জননেতা
নিজের ব্যক্তিগত কষ্ট, নির্যাতন উপেক্ষা করে ইসহাক খন্দকার নিজেকে উৎসর্গ করেছেন নোয়াখালীর জনগণের কল্যাণে। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন একটি আত্মনির্ভরশীল সমাজের। তাই তিনি নোয়াখালীর বেকার যুবসমাজ এবং নারী-পুরুষের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। মাদকাসক্তি থেকে যুবসমাজকে মুক্ত করতে তিনি চালু করেছেন মাদকমুক্ত নোয়াখালী গঠন আন্দোলন, যেখানে অস্ত্রের বিপরীতে বিপথগামী যুবকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে কুরআন, হাদিস ও নৈতিক শিক্ষার বই। মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে তিনি নিশ্চিত করছেন সকলের জন্য শিক্ষার সুযোগ। অস্বচ্ছল পিতার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়ে দরিদ্র ছেলে-মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, অসহায় নারী-পুরুষদের চিকিৎসাসেবা প্রদানের মাধ্যমে তাঁদের দুঃখ লাঘব করেছেন। বহুবিধ মানবকল্যাণকর কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি নোয়াখালীতে একটি সুন্দর, সুবিচারপূর্ণ, আধুনিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপই তাঁর গভীর দেশপ্রেম ও মানবতাবাদের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ইসহাক খন্দকার, কেবল একটি নাম নয়, এটি ইসলামী আন্দোলনের এক প্রবাদপুরুষ। ত্যাগের আলোকিত বাতিঘর। তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে, শত নির্যাতনের মুখেও সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থেকেছেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, জুলুম যত বড়ই হোক না কেন, মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর আদর্শের প্রতি অবিচল বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়। তাঁর সংগ্রাম, তাঁর ত্যাগ, তাঁর নেতৃত্ব আমাদের অনুপ্রেরণা যোগায় একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার।